রাজা লক্ষণ সেন: বাংলার সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে তাঁর অবদান
সারসংক্ষেপ (Abstract) প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন রাজবংশের সর্বশেষ পরাক্রমশালী শাসক রাজা লক্ষণ সেনের (আনুমানিক ১১৭৮–১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ) রাজত্বকাল কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত। ১২০৪-০৫ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজির নদীয়া আক্রমণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন ঘটলেও, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত সাহিত্য, স্মৃতিশাস্ত্র, দর্শন এবং ভাস্কর্যশিল্পের যে চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল, তা বাংলার ইতিহাসে অদ্বিতীয়। বিশেষত, তাঁর রাজসভা কেন্দ্রিক ‘পঞ্চরত্ন’ কবিদের সাহিত্যকর্ম পরবর্তীকালে বাংলার সমাজ ও বৈষ্ণব আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই প্রবন্ধে রাজা লক্ষণ সেনের শাসনামলে বাংলার সাহিত্য, ধর্ম, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতিতে তাঁর বহুমুখী অবদান বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

১. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সেন বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক বল্লাল সেন এবং চালুক্য রাজকন্যা রমা দেবীর পুত্র লক্ষণ সেন ষাট বছর বয়সে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। যৌবনে তিনি একজন অসামান্য যোদ্ধা ছিলেন এবং গৌড়েশ্বর, কলিঙ্গ, কামরূপ ও কাশী পর্যন্ত সেন সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। তিনি ‘অরিরাজ-মদন-শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল নদীয়ার নবদ্বীপ, বিক্রমপুর এবং গৌড়। রাজনৈতিকভাবে তাঁর জীবনের শেষভাগ তুর্কি আক্রমণে বিপর্যস্ত হলেও, বিদ্যা ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনি ছিলেন বিক্রমাদিত্য বা হর্ষবর্ধনের সমতুল্য।
২. নিজস্ব বিদ্যাচর্চা ও সাহিত্যকর্ম
লক্ষণ সেন কেবল পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত শাস্ত্রজ্ঞ ও কবি।
- অদ্ভুতসাগর সমাপ্তকরণ: তাঁর পিতা রাজা বল্লাল সেন ১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং লক্ষণ-সংক্রান্ত সুবিশাল গ্রন্থ ‘অদ্ভুতসাগর’ রচনা শুরু করেন। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বানপ্রস্থে (সন্ন্যাস) চলে যাওয়ায় গ্রন্থটি অসমাপ্ত থাকে। পিতার আদেশে লক্ষণ সেন তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের সাহায্যে এই জটিল গ্রন্থটি সফলভাবে সমাপ্ত করেন।
- সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে উপস্থিতি: তাঁর রাজসভার সংকলিত গ্রন্থ ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-এ স্বয়ং লক্ষণ সেনের রচিত একাধিক সংস্কৃত শ্লোক পাওয়া যায়। তাঁর শ্লোকগুলোতে শব্দচয়ন এবং ছন্দের ব্যবহার প্রমাণ করে যে তিনি একজন প্রথম সারির কবি ছিলেন।
৩. রাজসভার ‘পঞ্চরত্ন’ এবং সাহিত্যের স্বর্ণযুগ
লক্ষণ সেনের রাজসভা ছিল ভারতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, কবি ও দার্শনিকদের মহামিলনকেন্দ্র। তাঁর রাজসভায় পাঁচজন কিংবদন্তি কবি ছিলেন, যাঁদের একত্রে ‘পঞ্চরত্ন’ বলা হতো। সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসে এই পঞ্চরত্নের অবদান অপরিসীম:
- ১. কবি জয়দেব ও ‘গীতগোবিন্দম্’: পঞ্চরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্ন ছিলেন কবি জয়দেব। তাঁর রচিত ‘গীতগোবিন্দম্’ সংস্কৃত সাহিত্যের একটি কালজয়ী গীতি-কাব্য। ১২টি সর্গ এবং ২৪টি গানে (অষ্টপদী) রচিত এই কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ ও মিলন অত্যন্ত মধুর ও ভাবগম্ভীর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। এই কাব্যের বিখ্যাত ‘দশাবতার স্তোত্র’ হিন্দু ধর্মে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলনে এবং বাংলার পদাবলি সাহিত্যে গীতগোবিন্দের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
- ২. ধোয়ী এবং ‘পবনদূত’: মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের অনুপ্রেরণায় কবি ধোয়ী রচনা করেন ‘পবনদূত’। কাব্যের বিষয়বস্তু হলো— রাজা লক্ষণ সেন দক্ষিণ ভারত বিজয়ে গেলে মলয় পর্বতের গন্ধর্বকন্যা কুবলয়বতী তাঁর প্রেমে পড়েন এবং পবন বা বাতাসকে দূত হিসেবে লক্ষণ সেনের কাছে পাঠান। এই কাব্যে তৎকালীন বাংলার সুহ্ম, তাম্রলিপ্তি, ত্রিবেণী ও বিজয়পুরের যে ভৌগোলিক ও সামাজিক বর্ণনা পাওয়া যায়, তা ঐতিহাসিকদের জন্য এক অমূল্য দলিল।
- ৩. গোবর্ধন আচার্য ও ‘আর্যাসপ্তশতী’: তিনি রচনা করেন ‘আর্যাসপ্তশতী’। এটি ‘আর্যা’ ছন্দে রচিত ৭০০টি শ্লোকের একটি সংকলন। এতে তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ জীবন, কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং সাধারণ মানব-মানবীর প্রেম ও শৃঙ্গার রস অত্যন্ত বাস্তবানুগভাবে ফুটে উঠেছে।
- ৪. উমাপতিধর: তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত কবি, মন্ত্রী এবং শিলালিপি রচয়িতা। লক্ষণ সেনের ‘মাধাইনগর তাম্রশাসন’ এবং অন্যান্য বেশ কিছু রাজকীয় প্রশস্তি তাঁরই রচনা। জয়দেব তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, শব্দের ঝংকারে উমাপতিধরের সমকক্ষ কেউ ছিল না।
- ৫. কবি শরণ: দ্রুত কবিতা রচনায় তাঁর খ্যাতি ছিল। তাঁর রচিত কোনো একক গ্রন্থ না পাওয়া গেলেও ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ গ্রন্থে তাঁর বহু শ্লোক সংকলিত রয়েছে।
৪. শাস্ত্রচর্চা, স্মৃতিশাস্ত্র ও অন্যান্য পণ্ডিতগণ
পঞ্চরত্ন ছাড়াও লক্ষণ সেনের রাজসভায় বহু খ্যাতিমান পণ্ডিত ছিলেন যাঁরা আইন, ধর্ম ও সমাজনীতি নিয়ে যুগান্তকারী গ্রন্থ রচনা করেছিলেন:
- হলায়ুধ মিশ্র: তিনি ছিলেন লক্ষণ সেনের প্রধান বিচারপতি (ধর্মাধ্যক্ষ) এবং মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর রচিত ‘ব্রাহ্মণসর্বস্ব’ গ্রন্থটি হিন্দু সমাজের দৈনন্দিন পূজা-পার্বণ, সংস্কার ও নিয়ম-নীতির এক প্রামাণ্য দলিল। এছাড়াও তিনি ‘মীমাংসাসর্বস্ব’, ‘বৈষ্ণবসর্বস্ব’ এবং ‘শৈবসর্বস্ব’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন।
- শ্রীধরদাস এবং ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’: লক্ষণ সেনের এক সামন্তরাজা বটুদাসের পুত্র ছিলেন শ্রীধরদাস। তিনি ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে (তুর্কি আক্রমণের ঠিক আগে) ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ নামক একটি বিশাল শ্লোকসংকলন রচনা করেন। এতে প্রাচীন ও সমসাময়িক প্রায় ৪৪৬ জন কবির ২৩৭০টি শ্লোক স্থান পেয়েছে। প্রাচীন বাংলার সাহিত্যের ইতিহাস পুনর্নির্মাণে এটি এক বিশ্বকোষতুল্য গ্রন্থ।
- পশুপতি ও ঈশানচন্দ্র: হলায়ুধের দুই ভাই পশুপতি ও ঈশানচন্দ্রও ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত। পশুপতি ‘পশুপতি পদ্ধতি’ নামক শ্রাদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন।
৫. ধর্মীয় রূপান্তর ও সামাজিক প্রভাব
সেন বংশের প্রথম দিকের রাজারা (বিজয় সেন, বল্লাল সেন) ছিলেন গোঁড়া শৈব (শিবের উপাসক)। কিন্তু লক্ষণ সেন তাঁর রাজত্বকালে একটি বড় ধর্মীয় পরিবর্তন আনেন।
- বৈষ্ণব ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা: তিনি নিজে শৈব ধর্ম থেকে বৈষ্ণব ধর্মে আকৃষ্ট হন এবং ‘পরম বৈষ্ণব’ ও ‘পরম নারসিংহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। রাজার এই বৈষ্ণব প্রীতির কারণেই জয়দেবের মতো বৈষ্ণব কবিরা রাজসভায় সর্বোচ্চ সম্মান পান। লক্ষণ সেনের এই পৃষ্ঠপোষকতাই মূলত দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের বীজ রোপণ করেছিল, যা পরবর্তীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরে মহীরুহে পরিণত হয়।
৬. শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নবদ্বীপের উত্থান
লক্ষণ সেনের রাজধানী নবদ্বীপ কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না, এটি পরিণত হয়েছিল ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’-এ। তাঁর আমলেই নবদ্বীপে বেদ, স্মৃতিশাস্ত্র, ব্যাকরণ ও দর্শনের বহু টোল গড়ে ওঠে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী জুড়ে নবদ্বীপ যে নব্য-ন্যায় ও বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল, তার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন রাজা লক্ষণ সেন।
৭. লক্ষণাব্দ (La-Sam) প্রবর্তন এবং ঐতিহাসিক প্রভাব
লক্ষণ সেনের রাজ্যাভিষেক অথবা জন্মসালকে কেন্দ্র করে বাংলায় একটি নতুন অব্দ বা বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়, যা ‘লক্ষণাব্দ’ বা La-Sam নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে এটি ১১১৯ অথবা ১১৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলায় সেন শাসনের অবসানের পরও বিহারের মিথিলা এবং নেপালের কিছু অঞ্চলে কয়েক শতাব্দী ধরে এই ‘লক্ষণাব্দ’ ব্যবহৃত হয়েছে। এটি তাঁর সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের একটি বড় প্রমাণ।
৮. ভাস্কর্য ও শিল্পকলা
সেন যুগে, বিশেষ করে লক্ষণ সেনের সময়ে, বাংলার ভাস্কর্যশিল্প (Pala-Sena Art) এক অনন্য রূপ লাভ করে। এই সময় কালো কষ্টিপাথরের (Black Basalt) তৈরি বহু দেব-দেবীর মূর্তি নির্মিত হয়। লক্ষণ সেনের আমলের মূর্তিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অলংকারবহুল এবং নিখুঁত পলিশ করা হতো। বিষ্ণু, সূর্য ও শিব-পার্বতীর বহু অনবদ্য ভাস্কর্য এই যুগের শিল্পরুচির সাক্ষ্য দেয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
উপসংহার রাজা লক্ষণ সেনের জীবনের ট্র্যাজেডি হলো, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তিনি শেষ বয়সে চরম ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বখতিয়ার খলজির অতর্কিত আক্রমণে বিনা যুদ্ধে তাঁর নবদ্বীপ ত্যাগ করার ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় তাঁকে একজন দুর্বল শাসক হিসেবে চিত্রিত করেছে। কিন্তু যদি আমরা রাজনৈতিক চশমা খুলে কেবল শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মানদণ্ডে তাঁকে বিচার করি, তবে তিনি নিঃসন্দেহে প্রাচীন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি। তাঁর রাজসভা যে অসামান্য সাহিত্য-সম্পদ সৃষ্টি করেছিল, তা ধ্বংসলীলার মাঝেও টিকে থেকেছে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও হিন্দু সমাজ-ব্যবস্থার ভিত্তিমূল গড়ে দিয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজা লক্ষণ সেন কেবল একজন পরাজিত সেনাপতি নন, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক নবজাগরণের এক অবিস্মরণীয় মহানায়ক।








