২০২৫-২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য: বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

২০২৫-২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য: বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ — একটি ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ

কার্যনির্বাহী সারসংক্ষেপ এবং কাঠামোগত প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করে। দীর্ঘ পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এই পটপরিবর্তনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সমমনা জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হয়।

ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রায় দুই বছর ধরে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে নীরব থাকলেও, ২০২৫ সালের শেষার্ধ এবং বিশেষ করে ২০২৬ সালে তিনি ভারত থেকে বিশ্বের প্রথম সারির আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোর (যেমন: রয়টার্স, প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই, এবং এনডিটিভি) সাথে ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার, বিবৃতি এবং সংবাদ সম্মেলন প্রদান শুরু করেন। এই প্রবন্ধটির মূল লক্ষ্য হলো ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য, অভিযোগ এবং ঘোষণার একটি বস্তুনিষ্ঠ, গভীর ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা। তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) রায় প্রত্যাখ্যান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও তার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা।

২০২৫-২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য: বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
২০২৫-২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য: বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, শেখ হাসিনা তার বক্তব্যগুলোর মাধ্যমে একদিকে যেমন বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা ও শাসনতান্ত্রিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চ্যালেঞ্জ করেছেন, অন্যদিকে নিজেকে এবং তার দল আওয়ামী লীগকে একটি স্থিতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার কৌশল গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেদনটি তার এই দাবিগুলোর পেছনের রাজনৈতিক কৌশল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব, মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ও নিবিড় আলোচনা করবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) এবং বিচারিক মেরুকরণ

শেখ হাসিনার ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের বক্তব্যগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণবিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়কালে প্রায় ১,৪০০ (বিতর্কিত) মানুষ নিহত হয়। এই প্রাণহানির সম্পূর্ণ দায়ভার তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের উপর বর্তায়। পরবর্তীতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জুলাই-আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনার আমলেই গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) কাঠামো ও ম্যান্ডেট পরিবর্তন করে।

এই ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সরকারি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (ICT-1) এক রায়ে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে (in absentia) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। বিচারক বিচারপতি মজুমদার ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই সুদীর্ঘ রায় পাঠ করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয় যে, আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে এবং শেখ হাসিনাসহ দণ্ডিতদের মধ্যে এর জন্য কোনো প্রকার অনুশোচনা দেখা যায়নি। বিচারিক কার্যক্রমে ৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয় যে, পাঁচজন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, যার সাথে আসামিদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততা ছিল। ট্রাইব্যুনাল সাবেক আইজিপি মামুনকে সত্য উদঘাটনে সহায়তা করার কারণে তুলনামূলকভাবে লঘু দণ্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে, শেখ হাসিনার একটি অডিও ফাঁস হয় যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে ২২৬ জনকে হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।” এই মন্তব্যের কারণে ট্রাইব্যুনাল বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার দায়ে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছিল।

এই মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তীব্র মেরুকরণের সৃষ্টি করে। বর্তমান সরকার ও জুলাই আন্দোলনের সমর্থকরা এটিকে ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে উদযাপন করলেও, শেখ হাসিনা এবং তার সমর্থকরা এটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘ডেথ পেনাল্টি রিসার্চ ইউনিট’-এর গবেষক তাকবির হুদা বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই মৃত্যুদণ্ডের রায়টি বরং শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কিছুটা সহানুভূতি অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। এই চরম দণ্ডাদেশের কারণে তিনি নিজেকে একজন পলাতক আসামির বদলে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার এবং একটি ‘প্রহসনের বিচারের’ ভুক্তভোগী হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছেন, যা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফোর্টিফাই রাইটস’ (Fortify Rights) মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড প্রথা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে, যা পশ্চিমা বিশ্বে এই বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি সূক্ষ্ম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিচারিক প্রক্রিয়ার উপাদানআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) সিদ্ধান্ত ও রায়শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও দাবি
ট্রাইব্যুনালের বৈধতা২০১০ সালের আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচার, যা বর্তমান সরকার কর্তৃক সংশোধিত।অনির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটবিহীন সরকার কর্তৃক গঠিত অবৈধ ট্রাইব্যুনাল।
অভিযোগের ধরনজুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং মৃতদেহ পোড়ানোর প্ররোচনা।উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ। প্রকৃত চরমপন্থীদের দায়মুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা।
চূড়ান্ত রায় (নভেম্বর ২০২৫)শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড। আইজিপি মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড।রায় প্রত্যাখ্যান। এটিকে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য ও নির্মূল করার একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা।

গণতান্ত্রিক পরিসর সংকোচন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বর্জন

২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই) এবং এর আগে এনডিটিভি ও রয়টার্সকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক অবস্থা নিয়ে তীব্র ও কাঠামোগত সমালোচনা উপস্থাপন করেন। তার এই সমালোচনাগুলোর গভীরে গেলে দেখা যায়, তিনি মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

শেখ হাসিনা দাবি করেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি “মারাত্মক জাতীয় সংকটের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গণতান্ত্রিক পরিসর সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার যুক্তি হলো, একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কখনোই স্থিতিশীল হতে পারে না যদি সে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে বর্জন করা হয়। তিনি বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠন করতে হলে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং কোনো দলকে নিষিদ্ধ করে বা গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করে কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব নয়। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, ক্ষমতার পালাবদল কেবল জনগণের ভোটের মাধ্যমে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। যদি জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, তবেই তারা দেশ পরিচালনা করবে, অন্যথায় জনগণের রায় হাসিমুখে মেনে নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার এই দাবিগুলোর আংশিক প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। ‘ফ্রিডম হাউস’-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোকে নিয়মিতভাবে প্রকল্প অনুমোদনে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং তারা ব্যাপক হয়রানি ও নজরদারির শিকার হচ্ছে। একইভাবে, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ (HRW)-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নতুন সরকার সংসদে এমন তিনটি আইন অনুমোদন করেছে যা মানবাধিকার সুরক্ষাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে এবং ক্ষমতাবানদের অপব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে। এই প্রতিবেদনগুলো শেখ হাসিনার সেই দাবিকেই শক্তিশালী করে যে, স্বৈরাচার পতনের নামে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারাও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।

শেখ হাসিনা বর্তমান বিচার ব্যবস্থাকে “রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো প্রকৃত সুযোগ না দিয়ে যে মৃত্যুদণ্ড চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই ‘ন্যায়বিচার’ বলা চলে না। তার মতে, বর্তমান শাসনব্যবস্থা এমন একটি বিচারিক প্রহসন তৈরি করেছে যেখানে প্রকৃত খুনি ও চরমপন্থীদের ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, অথচ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন তোলেন যে, যদি ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিই ন্যায়বিচার চাইতো, তবে কেন তারা ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই গঠিত স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনকে বাতিল করে দিল, যা গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য গঠন করা হয়েছিল।

মানবাধিকার বিপর্যয়, চরমপন্থার উত্থান এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

২০২৫-২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার প্রচারণার অন্যতম প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার ছিল বাংলাদেশের অবনতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি। এটি এমন একটি স্পর্শকাতর ইস্যু যা পশ্চিমা বিশ্ব এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নীতি-নির্ধারকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক (Volker Türk) ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে ব্যাপক দমন-পীড়ন চলছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘের কঠোর সতর্কবার্তার ফলেই সেনাবাহিনী জনগণের উপর হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকে, কারণ তাদের ভয় ছিল যে এর ফলে তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা পাঠানোর যোগ্যতা হারাতে পারে। ভলকার টুর্কের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে তারা মানবাধিকার সুরক্ষার একটি বিজয় হিসেবে দেখেছিল।

কিন্তু শেখ হাসিনা তার ২০২৬ সালের বিবৃতিগুলোতে এই আখ্যানটিকে সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে “রিইনভেন্টিং বাংলাদেশ: অ্যা ওয়ার্ল্ড ক্রাইসিস টু ওভারকাম” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক কৌশলগত সংলাপে তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান সরকার চরমপন্থীদের মদদ দিচ্ছে এবং জেল ভেঙে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন (যেমন: আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরীর, হরকাত-উল-জিহাদ এবং জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ)-এর নেতাদের মুক্ত করে দিয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যেভাবে চরমপন্থার উত্থান ঘটেছিল, ঠিক একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এখন ঘটছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ৪৬০টি থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে ওভারব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং এর ফলশ্রুতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

অক্টোবর ২০২৬ সালে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন একটি বাংলাদেশ কখনোই কাঙ্ক্ষিত ছিল না যেখানে পুলিশ, ড্রোন ও রাজনৈতিক দলের পাহারাদারদের প্রহরায় পূজার আয়োজন করতে হয়, বা কোনো মায়ের তার সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তার অভাব বোধ করতে হয়। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ (BHBCUC)-এর বিবৃতি উল্লেখ করে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। লেমকিন ইন্সটিটিউট (Lemkin Institute) তাদের এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যার উত্তরাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ আখ্যানের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ।

আর্থ-সামাজিক ও নিরাপত্তা সূচকশেখ হাসিনার দাবি অনুযায়ী তার শাসনামলের অর্জন (২০০৯-২০২৪)শেখ হাসিনার বর্ণনায় বর্তমান প্রশাসনের পরিস্থিতি (২০২৪-২০২৬)
অর্থনৈতিক অবস্থান১৫ বছরে বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে রূপান্তর। চরম দারিদ্র্য ৫.৬% এ নেমে আসা।মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা, সাধারণ মানুষের জীবিকার সংকট।
জাতীয় নিরাপত্তা ও চরমপন্থা২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন এবং জঙ্গি নেটওয়ার্ক (JMB, HuJI) শক্ত হাতে দমন।জেল ভেঙে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিজবুত তাহরীরের নেতাদের মুক্তিদান, চরমপন্থার পুনরুত্থান।
স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোবিদ্যুৎ উৎপাদন ৪,৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন।প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে টিকার অভাবে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু এবং স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়।

পররাষ্ট্রনীতির ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা: ব্রিকস সম্মেলন এবং কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা

আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের একটি বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তার বৈদেশিক সম্পর্কের বাইরে নয়, এবং শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দিয়ে তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে সফর করেন, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট পালাবদল হিসেবে বিবেচিত হয়। শেখ হাসিনা এই সিদ্ধান্তকে “অপরিণত ও আত্মঘাতী” (Immature and counterproductive) বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, ব্রিকস কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক জমায়েত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারতো। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর করা সম্ভব নয় এবং এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিবেশ “দূষিত” (vitiated) হয়েছে। শেখ হাসিনা এই যুক্তির তীব্র সমালোচনা করে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “১৯৭৯ সালে যখন জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেন, তখন আমি দিল্লিতেই নির্বাসনে ছিলাম। যখন তিনি ১৯৮০ সালে লন্ডনে যান, আমিও তখন লন্ডনে ছিলাম। আমার উপস্থিতি যদি তখন তার সফরের ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে থাকে, তবে আজ দিল্লিতে আমার উপস্থিতির কারণে জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান কেন ভারতে আসতে পারবেন না? এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রকৃত কারণ কী?”।

শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন যে, একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়; এটি পরিচালিত হওয়া উচিত বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের আলোকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূলমন্ত্র “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” (Friendship to all, malice to none) স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধু। তার শাসনামলে ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (যার মাধ্যমে ৬৪,০০০ শরণার্থী ভারত থেকে ফিরে আসে), ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তি (LBA), কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস রুট, মৈত্রী ট্রেন, এবং ভারতীয় ডিজেল পাইপলাইনের মতো যুগান্তকারী কানেক্টিভিটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।

একইসাথে তিনি এও স্বীকার করেন যে, চীন বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আসিয়েন এবং মুসলিম বিশ্ব—সবাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, চীন বা অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক রাখাটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখন শুরু হয় যখন “একটি সম্পর্ককে অন্য একটি সম্পর্কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়” এবং “দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে ভারত-বিরোধী মনস্তত্ত্বকে (anti-India rhetoric) উসকে দেওয়া হয়”। তিস্তা নদীর মতো আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, সে প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত পরিপক্ব কূটনৈতিক অবস্থান নেন। তিনি বলেন, এসব প্রকল্প শুধুমাত্র প্রকৌশলগত বা অবকাঠামোগত বিষয় নয়; এর সিদ্ধান্ত হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, কারিগরিভাবে নির্ভুল, পরিবেশগতভাবে দায়বদ্ধ এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল।

পররাষ্ট্রনীতির উপাদানশেখ হাসিনার শাসনামলের কৌশল (২০০৯-২০২৪)বর্তমান প্রশাসনের কৌশল (২০২৪-বর্তমান) (শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে)
ভারত সম্পর্কগভীর কৌশলগত মিত্রতা, কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।চরম ভারত-বিরোধী মনস্তত্ত্ব, শীর্ষ সম্মেলন বর্জন, ট্রানজিট প্রকল্প স্থবির এবং সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি।
চীন সম্পর্কঅবকাঠামোগত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ব্যবহার, তবে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনায় রাখা।ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান, যার ফলে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
আঞ্চলিক জোট (BRICS/BIMSTEC)সক্রিয় অংশগ্রহণ, বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সুবিধার সন্ধান এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদান।ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার অজুহাতে বর্জন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশকে কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন করা।

প্রত্যাবর্তনের কৌশলগত রূপরেখা: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে শেখ হাসিনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং সাহসী ঘোষণাটি ছিল বাংলাদেশে ফিরে আসার সময়সীমা নির্ধারণ। রয়টার্স, এনডিটিভি এবং অন্যান্য বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন এবং সরাসরি আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করে আইনি লড়াই করবেন। তার এই ঘোষণা কেবল একটি আবেগঘন বক্তব্য নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) এবং রাজনৈতিক চাল।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে বেশ কয়েকটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, দলীয় পুনর্গঠন। ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ সিনিয়র নেতা হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন অথবা বিদেশে পালিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ ভুঁইফোড় সংগঠন নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা একটি অদম্য শক্তি যা এখনও দেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। তিনি দাবি করেন যে, তিনি অনলাইনে ১২৫টি সংসদীয় আসনের তৃণমূল নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে দলকে পুনর্গঠিত করছেন। তার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা আত্মগোপনে থাকা ভীত-সন্ত্রস্ত কর্মীদের মাঝে নতুন করে উদ্দীপনা ও সাহস তৈরি করার একটি নিখুঁত কৌশল।

দ্বিতীয়ত, আদালতের বিচারকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা। শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন যাতে দেশবাসী এবং বিশ্ব সম্প্রদায় দেখতে পায় যে এই আদালত ও বিচার ব্যবস্থা কতটা প্রহসনমূলক। তিনি নির্বাসনে থাকা অন্যান্য নেতাদেরও একই সাথে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানান, যাতে সরকার হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে নিয়ে একটি অপ্রীতিকর আইনি ও মানবাধিকার সংকটে পতিত হয়।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং নেতৃত্বের প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করেন যে বর্তমান সরকারের অদক্ষতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চরমপন্থার উত্থানের কারণে সাধারণ মানুষ দ্রুত মোহমুক্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি দেশে ফিরে গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে নিজেকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তিনি আবেগঘন ভাষায় বলেন, “যদি মৃত্যুও আসে, আমি আমার নিজের মাটিতেই মরতে চাই—যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।”। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন যে, তিনি রাজনীতি করেছেন শুধুমাত্র মানুষের কল্যাণের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়।

শেখ হাসিনার এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ঢাকা সরাসরি শেখ হাসিনার এই মিডিয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের আইনমন্ত্রী এম আসাদুজ্জামান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশের সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি বলেন, “সেটা তার সমস্যা, আমার নয়। তিনি যখনই আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করবেন, আইন আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছে আমি তা প্রয়োগ করব।” তিনি এমনকি শেখ হাসিনাকে সরাসরি আদালতে আত্মসমর্পণ করার সুযোগ না দেওয়ারও প্রচ্ছন্ন হুমকি প্রদান করেন। এর পাশাপাশি, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ (FCC)-এর একটি অনুষ্ঠানে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে সাথে নিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়, যা ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কে আরও উত্তাপ ছড়ায়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। একদল মানুষ তাকে ‘মাফিয়া কুইন’ ও ‘স্বৈরাচারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকর করার অপেক্ষায় রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সমর্থক এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা মনে করেন, তার ফিরে আসা উচিত শুধুমাত্র তার দণ্ড কার্যকর করার জন্য। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তার নেতৃত্বকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মূল কারিগর হিসেবে বিবেচনা করে। তারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই এবং সাধারণ মানুষ তার ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে। এই মেরুকরণ প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হলেও, সমাজের একটি বৃহৎ অংশের মাঝে তাদের আদর্শিক উপস্থিতি ও সমর্থন এখনও প্রবলভাবে বিদ্যমান।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

শেখ হাসিনার ভারতে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান এবং সেখান থেকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যকার সম্পর্ককে ইতিহাসের অন্যতম গভীর সংকটে ফেলেছে। বাংলাদেশ সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের (extradition) অনুরোধ জানিয়েছে, যা ভারত বর্তমানে “পর্যবেক্ষণাধীন” (under examination) রেখেছে বলে কূটনৈতিকভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, একটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের মানুষের সর্বোত্তম স্বার্থ, শান্তি, গণতন্ত্র এবং স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং তারা সকল অংশীদারের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ভারত সরকারের এই নীরবতা ও কৌশলগত অবস্থান তারেক রহমান প্রশাসনের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক ভিসা প্রদান, বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত প্রকল্প এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভারত মূলত শেখ হাসিনাকে একটি ভূ-রাজনৈতিক ‘লিভারেজ’ বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ঢাকা যদি চীনের দিকে অতিরিক্ত মাত্রায় ঝুঁকে পড়ে বা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে ভারত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখতে পারে।

উপসংহার এবং কৌশলগত পূর্বাভাস

২০২৫ এবং ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক উপস্থিতি নিছক কোনো ক্ষমতাচ্যুত নেতার আক্ষেপ বা হাহাকার নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার সংকট, গণতান্ত্রিক শূন্যতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং চরমপন্থার উত্থানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন। একই সাথে তিনি তার দল আওয়ামী লীগকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, স্থিতিশীল এবং উন্নয়নমুখী শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার একটি স্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন।

ব্রিকস সম্মেলন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রতিটি ইস্যুতেই তিনি বর্তমান প্রশাসনের বৈধতা, দূরদর্শিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে তার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী প্রভাব ফেলবে বলে নিশ্চিতভাবে ধারণা করা যায়। এটি হয় বর্তমান সরকারের বিচারিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করার সুযোগ তৈরি করবে, অথবা দেশে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতার নতুন এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা করবে।

পরিশেষে, একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল কোনো ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বর্জনের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠতে পারে না; এটি নির্ভর করবে অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন প্রধান দায়িত্ব হলো ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা, যার প্রয়োজনীয়তার কথা শেখ হাসিনা তার নির্বাসিত জীবন থেকেও বারবার বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

Scroll to Top