২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবি কি সত্য? বাজেটের গাণিতিক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বয়ান বনাম অংকের বাস্তবতা: ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার তত্ত্বের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত অভিযোগগুলোর একটি হলো— বিগত ১৭ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, বিশেষ করে তারেক রহমান, তাদের বক্তৃতা ও সংলাপে এই সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে আসছেন। মূলত বিগত সরকারের শাসনামলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এই বিশাল অংকের কথা বলা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলা এই কথাটি গাণিতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ? চলুন, আবেগ বা অন্ধ বিরোধিতার বাইরে গিয়ে সাধারণ অংকের নিয়মে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক।

২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবি কি সত্য
২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবি কি সত্য

১৬ বছরের বাজেটের খতিয়ান যেকোনো সরকার প্রতি অর্থবছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করে বাজেট পেশ করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাজেটেই ঘাটতি থাকে, অর্থাৎ যা ঘোষণা করা হয় তার পুরোটাই যে সরকারের কোষাগারে থাকে বা খরচ করতে পারে, বিষয়টি তেমন নয়। তবুও তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিচ্ছি ঘোষিত বাজেটের সম্পূর্ণ অর্থই সরকার পেয়েছিল।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংসদে ঘোষিত ১৬টি অর্থবছরের বাজেটের আকারগুলো ছিল নিম্নরূপ:

  • ২০০৯-১০ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ১,১৩,৮১৯ কোটি টাকা
  • ২০১০-১১ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ১,৩২,১৭০ কোটি টাকা
  • ২০১১-১২ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ১,৬৩,৫৮৯ কোটি টাকা
  • ২০১২-১৩ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ১,৯১,৭৩৮ কোটি টাকা
  • ২০১৩-১৪ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ২,২২,৪৯১ কোটি টাকা
  • ২০১৪-১৫ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ২,৫০,৫০৬ কোটি টাকা
  • ২০১৫-১৬ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ২,৯৫,১০০ কোটি টাকা
  • ২০১৬-১৭ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ৩,৪০,৬০৫ কোটি টাকা
  • ২০১৭-১৮ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ৪,০০,২৬৬ কোটি টাকা
  • ২০১৮-১৯ (আবুল মাল আবদুল মুহিত): ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকা
  • ২০১৯-২০ (আ হ ম মুস্তফা কামাল): ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা
  • ২০২০-২১ (আ হ ম মুস্তফা কামাল): ৫,৬৮,০০০ কোটি টাকা
  • ২০২১-২২ (আ হ ম মুস্তফা কামাল): ৬,০৩,৬৮১ কোটি টাকা
  • ২০২২-২৩ (আ হ ম মুস্তফা কামাল): ৬,৭৮,০৬৪ কোটি টাকা
  • ২০২৩-২৪ (আ হ ম মুস্তফা কামাল): ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকা
  • ২০২৪-২৫ (আবুল হাসান মাহমুদ আলী): ৭,৯৭,০০০ কোটি টাকা (যদিও এই বাজেট পেশের দুই মাস পর সরকার পতন ঘটে, তবুও হিসাবের সুবিধার্থে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হলো)।

উপরোক্ত ১৬টি অর্থবছরের মোট বাজেটের পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা

ডলারের অংকে রূপান্তর এবং পাচারের হিসাব বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ডলারের মূল্য ১২২ টাকা ধরলে, ১৬ বছরের মোট বাজেটের (৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা) পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

এখন, রাজনৈতিক নেতাদের, বিশেষ করে তারেক রহমানের দাবি অনুযায়ী যদি ধরে নেওয়া হয় যে, শেখ হাসিনা সরকার ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করেছে, তবে মোট ৫৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে এই পাচার হওয়া অংশটি বাদ দিতে হবে। হিসাব: ৫৩৩ বিলিয়ন – ২৩৪ বিলিয়ন = ২৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, পাচার হওয়ার পর রাষ্ট্রের কাছে অবশিষ্ট ছিল ২৯৯ বিলিয়ন ডলার।

রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ব্যয় রাষ্ট্র শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে চলে না, এর বিশাল একটি প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। প্রতিবছর সরকারি চাকরিজীবী, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, পেনশন ইত্যাদি বাবদ রাষ্ট্রকে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই বেতন-ভাতা বাবদ সরকারকে প্রতি বছর গড়ে ৭.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়। তাহলে ১৬ বছরে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ব্যয়: ৭.৩ × ১৬ = ১১৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

এখন, পাচার হওয়ার পর অবশিষ্ট ২৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ১১৬.৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে থাকে: ২৯৯ – ১১৬.৮ = ১৮২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

১৮২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারকে বাংলাদেশি মুদ্রায় (১ ডলার = ১২২ টাকা ধরে) রূপান্তর করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২২ লাখ ৪৬ হাজার ১০৫ কোটি টাকা

বাস্তবতার মুখোমুখি অংক এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায়। ১৬ বছরে রাষ্ট্রের কাছে সব খরচ ও কথিত পাচারের পর অবশিষ্ট ছিল মাত্র ২২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়ে কি ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশ পরিচালনা করা সম্ভব?

এই সীমিত অর্থ দিয়ে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রতিরক্ষার মতো নিয়মিত খাতগুলো চালাতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে যে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে— নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মহাসড়ক ফোর লেনে উন্নীতকরণ, শতভাগ বিদ্যুতায়ন— এসব কি আকাশ থেকে পড়েছে?

যাঁরা ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের দাবি করছেন, তাঁদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হওয়া উচিত: মাত্র ২২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কি এত সব মেগা প্রজেক্ট এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব? এই টাকা দিয়ে কি দৃশ্যমান উন্নয়নের পাঁচ ভাগের এক ভাগও করা সম্ভব ছিল?

উপসংহার

রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নানা ধরনের বাগাড়ম্বর বা ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যখন সেই অভিযোগটি অর্থনীতির মতো একটি গাণিতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হয়, তখন তাকে অবশ্যই অংকের ধোপে টিকতে হবে। বাজেটের আকার, রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যূনতম ব্যয় এবং দৃশ্যমান উন্নয়নের চিত্র প্রমাণ করে যে, ‘২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার’-এর যে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা ডাহা মিথ্যা এবং গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ অবাস্তব। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এমন ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করা কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই ছড়ায় না, বরং অভিযোগকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

Scroll to Top