জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ: ১৯৭১ সালের গণহত্যা এবং কৌশলগত ভূমিকা, গণহত্যার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দায়

ভূমিকা

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত জটিল এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং এর সমান্তরালে সংঘটিত গণহত্যার স্বরূপ বুঝতে হলে তৎকালীন রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণ বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ (তৎকালীন নিখিল পাকিস্তান জামাতে ইসলাম-এর পূর্ব পাকিস্তান শাখা) এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের ভূমিকা এই যুদ্ধের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জামায়াতে ইসলামীর দায় শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি একটি সুসংগঠিত আধা-সামরিক কাঠামো তৈরি এবং বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত নিধনের মাধ্যমে একটি গভীর অপরাধমূলক চরিত্রের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক অবস্থান এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে সংঘটিত তাদের কার্যক্রমসমূহ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। এই প্রবন্ধে জামায়াতে ইসলামীর উৎপত্তি, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তাদের কৌশলগত ভূমিকা, গণহত্যার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দায় এবং সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের গণহত্যা এবং কৌশলগত ভূমিকা, গণহত্যার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দায়
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের গণহত্যা এবং কৌশলগত ভূমিকা, গণহত্যার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দায়

জামায়াতে ইসলামীরআদর্শিক ভিত্তি এবং পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর হাত ধরে। মওদুদী একটি এমন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের ধারণার বিপরীতে অবস্থান করে। জামাতের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ সংস্কার করা, যা পরবর্তীতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান এবং ভারত—এই দুই অংশে বিভক্ত হয়ে যায় এবং পাকিস্তানের পূর্ব অংশে (বর্তমান বাংলাদেশ) তাদের কার্যক্রম বিস্তার করতে থাকে।

জামায়াতে ইসলামীর কাছে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ছিল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো। তারা বিশ্বাস করত যে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে টিকে থাকতে হবে। এই তাত্ত্বিক অবস্থানের কারণেই তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানকে একটি ‘হিন্দু ষড়যন্ত্র’ এবং ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের’ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাদের দৃষ্টিতে বাংলা ভাষা আন্দোলন বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল ইসলামী সংহতি নষ্ট করার একটি প্রয়াস। এই আদর্শিক গোঁড়ামিই ১৯৭১ সালে তাদের পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগীতে পরিণত হওয়ার প্রাথমিক ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।

জামায়াতে ইসলামীরআদর্শিক বিবর্তনের প্রধান পর্যায়সমূহ

সময়কালপ্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্যরাজনৈতিক অবস্থান
১৯৪১ – ১৯৪৭ইসলামী সমাজ সংস্কার এবং অবিভক্ত ভারতে মুসলিম স্বার্থ রক্ষামূলত সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন
১৯৪৭ – ১৯৭০পাকিস্তানের অখণ্ডতা এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও বিরোধী পক্ষ
১৯৭১বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং সশস্ত্র সহযোগিতাপাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রধান সহযোগী শক্তি
১৯৭২ – ১৯৭৮বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া এবং নেতাদের বিদেশে অবস্থাননিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল
১৯৭৯ – ২০০৮পুনরায় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন এবং ক্ষমতার অংশীদার হওয়াপ্রধান রাজনৈতিক জোটের অংশীদার

জামায়াতে ইসলামীরএই আদর্শিক অবস্থানটি মূলত ‘প্যান-ইসলামিক’ ঐক্যের ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল, যা আঞ্চলিক বা জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করত 5। ১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জনগণ তাদের অধিকার আদায়ে মুখর হয়েছিল, তখন জামায়াতে ইসলামীএটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখেনি, বরং একে ইসলামের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে চিত্রায়িত করেছিল।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের সূচনা এবং জামায়াতে ইসলামীরসশস্ত্র প্রতিরোধ

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামী উভয়ের জন্যই ছিল একটি বড় ধাক্কা। যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, তখন জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে এই সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন জানায়। তাদের মতে, এটি ছিল রাষ্ট্রকে বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষার একটি অনিবার্য পদক্ষেপ।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই জামায়াতে ইসলামীপাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্থানীয় সহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় ভাষা বোঝা সম্ভব নয়। এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই জামায়াতে ইসলামীতার নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন আধা-সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। এর মধ্যে ‘শান্তি কমিটি’ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্তর, যা স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর সমর্থকদের চিহ্নিত করতে এবং পাকিস্তানি সেনাদের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে ব্যবহৃত হতো।

আধা-সামরিক বাহিনীসমূহের গঠন ও সাংগঠনিক কাঠামো

জামায়াতে ইসলামীএবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস বাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনীগুলো কেবল স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নয়, বরং নিয়মিত বেতনভুক্ত এবং সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধীনে কাজ করত।

১. রাজাকার বাহিনী: ১৯৭১ সালের জুন মাসে জেনারেল টিক্কা খান রাজাকার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এই বাহিনী গঠন করেন। এর প্রথম ব্যাচের ৯৬ জন সদস্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় কর্মী, যারা খুলনার একটি আনসার ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। পরবর্তীতে এই বাহিনীতে বিহারী এবং পাকিস্তানপন্থী বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাজাকারদের প্রধান কাজ ছিল চেকপোস্ট পরিচালনা করা, টহল দেওয়া এবং মুক্তিবাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখা।

২. আল-বদর বাহিনী: এটি ছিল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ ঘাতক দল। আল-বদর মূলত বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে কাজ করত। এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মতিউর রহমান নিজামীর নাম ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। আল-বদর বাহিনী তাদের কাজের ধরনে রাজাকারদের চেয়ে অনেক বেশি নৃশংস এবং কৌশলী ছিল।

৩. আল-শামস: এটি মূলত মাদ্রাসা ছাত্র এবং কট্টর ইসলামপন্থীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। আল-শামসের মূল দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা এবং পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা 7

এই বাহিনীগুলোর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের পুরো নয় মাস ধরে যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তারা পাকিস্তানি সেনাদের কেবল পথই দেখায়নি, বরং হাজার হাজার বাঙালি নারীকে ধর্ষণ, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নিধন এবং সাধারণ নাগরিকদের হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: আল-বদর বাহিনীর পরিকল্পিত অপরাধ

১৯৭১ সালের গণহত্যার সবচেয়ে ঘৃণ্য এবং সুপরিকল্পিত অংশটি ছিল বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী নিধন। যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরাজয় অনিবার্য, তখন তারা এই ভূখণ্ডের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করে যাতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামীরছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যরা অর্থাৎ আল-বদর বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

৫ই ডিসেম্বর থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অধ্যাপক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আল-বদর বাহিনী আগে থেকেই এই বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা তৈরি করে রেখেছিল। তারা গভীর রাতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে নিহত কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

নামপেশাহত্যাকাণ্ডের সময়কাল
শহীদুল্লাহ কায়সারসাংবাদিক ও সাহিত্যিকডিসেম্বর ১৯৭১
মুনীর চৌধুরীঅধ্যাপক ও নাট্যকারডিসেম্বর ১৯৭১
সৈয়দ নাজমুল হকসাংবাদিকডিসেম্বর ১৯৭১
ডা. আলীম চৌধুরীচিকিৎসকডিসেম্বর ১৯৭১
সিরাজুদ্দীন হোসেনসাংবাদিকডিসেম্বর ১৯৭১

এই হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ওপর বর্তায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে প্রমাণিত হয়েছে যে, মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আল-বদর বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে এই নিধনযজ্ঞের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি ছিল একটি জাতির চিন্তা ও মননকে ধ্বংস করার দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

গণহত্যার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। তৎকালীন বিশ্ব ব্যবস্থা দুটি ব্লকে বিভক্ত ছিল এবং এই যুদ্ধের ওপর তার স্পষ্ট প্রভাব পড়েছিল। জামায়াতে ইসলামী এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে তাদের অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার পক্ষে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। তাদের তাত্ত্বিক কাগজপত্রে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের একটি যৌথ চক্রান্ত যা দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করতে চায়।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল চীন-মার্কিন সম্পর্কের উন্নয়নে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা। এই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ছিল গৌণ। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড যখন এই গণহত্যার খবর ওয়াশিংটনে পাঠান এবং একে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ (Selective Genocide) হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত এবং এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মহলের বড় একটি অংশ জেনেও এই গণহত্যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ভারতের ভূমিকা এখানে ছিল নির্ণায়ক। ভারত কেবল ১০ মিলিয়ন রিফিউজিকে আশ্রয়ই দেয়নি, বরং তারা মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণেও সহায়তা করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর কাছে ভারতের এই ভূমিকা ছিল একটি সরাসরি আক্রমণ। তারা বিশ্বাস করত যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ রুখতে হলে পাকিস্তানি সেনাদের জয়ী হওয়া আবশ্যক। এই বিশ্বাসের কারণেই তারা যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছিল, এমনকি যখন পরাজয় সুনিশ্চিত ছিল তখনও তারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হয়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বিচারিক দায় নির্ধারণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৩৯ বছর পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এই ট্রাইব্যুনালের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৭১ সালের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা এই ট্রাইব্যুনালের অধীনে বিচারের সম্মুখীন হন, কারণ তৎকালীন সময়ে তারাই ছিলেন রাজাকার এবং আল-বদর বাহিনীর মূল পরিচালক।

বিচারিক প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা উচ্চতর কমান্ডের দায়িত্বের নীতি প্রয়োগ করা হয়। এর অর্থ হলো, যদি কোনো সংগঠনের প্রধান হিসেবে কেউ তার অধীনে থাকা ব্যক্তিদের অপরাধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হন বা অপরাধের পরিকল্পনা করেন, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেই অপরাধের জন্য দায়ী হবেন। গোলাম আযম এবং মতিউর রহমান নিজামীর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছিল।

ট্রাইব্যুনালের প্রধান রায় এবং সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের তালিকা

নেতাপ্রধান অভিযোগসমূহরায় ও সাজাবাস্তবায়নের তারিখ
মতিউর রহমান নিজামীবুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণ এবং গণহত্যামৃত্যুদণ্ড ১১ মে ২০১৬
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদবুদ্ধিজীবী হত্যা এবং অপহরণমৃত্যুদণ্ড২২ নভেম্বর ২০১৫
গোলাম আযমষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং উস্কানি৯০ বছর কারাদণ্ড২৩ অক্টোবর ২০১৪ (মৃত্যু)
মীর কাসেম আলীনির্যাতন এবং চট্টগ্রামে গণহত্যামৃত্যুদণ্ড৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬
আব্দুল কাদের মোল্লামিরপুরে গণহত্যা ও ধর্ষণমৃত্যুদণ্ড১২ ডিসেম্বর ২০১৩5
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীধর্মীয় নিপীড়ন ও হত্যাযাবজ্জীবন কারাদণ্ড (পরিবর্তিত)১৪ আগস্ট ২০২৩ (মৃত্যু)

ট্রাইব্যুনালের এই রায়গুলো বাংলাদেশে যেমন ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়েছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিছু সমালোচনারও জন্ম দিয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো বিচারিক স্বচ্ছতা এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। তবে ভুক্তভোগী পরিবার এবং বাংলাদেশের বড় একটি অংশের কাছে এটি ছিল বহু প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে এটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৯৭১ সালে একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্রে পরিণত হয়েছিল।

যুদ্ধ-পরবর্তী জামায়াতে ইসলামী: নিষিদ্ধ হওয়া থেকে রাজনৈতিক উত্থান

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পর বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার জামায়াতে ইসলামীসহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। জামাতের অনেক নেতা সে সময় পাকিস্তানে পালিয়ে যান, আবার অনেকে ভারতে বন্দী হন।

তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল বিধি প্রবর্তন করা হয়, যার ফলে ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামী পুনরায় রাজনীতি করার বৈধতা পায়। এই সময় থেকেই জামায়াতে ইসলামী তাদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ শুরু করে। তারা তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

পরবর্তী কয়েক দশকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘কিংমেকার’ বা গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তারা ১৯৮০-র দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয় এবং ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-র সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বিষয়টি বাংলাদেশের একটি বড় অংশের কাছে ছিল চরম অপমানজনক, কারণ যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারাই স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা বহনকারী গাড়িতে ঘুরছিল।

জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং ক্ষমা প্রার্থনার বিতর্ক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে একটি গভীর সংকট তৈরি হয়। দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং দীর্ঘ কারাদণ্ড দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের মধ্যে একটি সংস্কারবাদী চিন্তার জন্ম দেয়। দলের একটি অংশ মনে করতে শুরু করে যে, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

এই সংস্কারবাদী ধারার অগ্রদূত ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, যিনি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রধান আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী যে ভুল করেছিল তার জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, জামাতে ইসলামকে বিলুপ্ত করে একটি নতুন নামে এবং সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্বের অধীনে রাজনীতিতে আসা উচিত।

এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ফলে ২০২০ সালে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) গঠিত হয়। এবি পার্টির মূল নেতৃত্বে ছিলেন জামাত এবং শিবিরের প্রাক্তন সদস্যরা যারা ১৯৭১ সালের দায় স্বীকার করার পক্ষে ছিলেন। এবি পার্টি নিজেদের একটি ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক’ এবং ‘উদারপন্থী’ দল হিসেবে পরিচয় দেয়, যা জামাতের কট্টরপন্থী আদর্শ থেকে ভিন্ন।

জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টির মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যজামায়াতে ইসলামীবাংলাদেশআমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি
৭১-এর ভূমিকাসরাসরি বিরোধিতা এবং সহযোগিতাভুল ছিল বলে স্বীকারোক্তি ও ক্ষমা প্রার্থনা
মূল আদর্শরাজনৈতিক ইসলাম ও শরীয়াহ শাসনসমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার
নারী ও সংখ্যালঘুশীর্ষ নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সকল ধর্মের ও লিঙ্গের জন্য নেতৃত্বের পথ উন্মুক্ত
রাজনৈতিক লক্ষ্যইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্র পরিচালনাকল্যাণ রাষ্ট্র গঠন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা

জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের দায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে ২০২৫ সালের দিকে এসে দলীয় প্রধান শফিকুর রহমান একটি ‘অস্পষ্ট’ ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি ১৯৪৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ‘যে কোনো ভুলের’ জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু ১৯৭১ সালের সুনির্দিষ্ট গণহত্যা বা বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় নিয়ে সরাসরি কোনো স্বীকারোক্তি দেননি। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক চাল যা আসন্ন নির্বাচনের আগে জনসমর্থন পাওয়ার জন্য করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনরুত্থান

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে একটি অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে, যার ফলে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীএবং ছাত্র শিবিরের কর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, যা তাদের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের বিরূপ মনোভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতে ইসলামীর ওপর থাকা দীর্ঘদিনের আইনি বাধানিষেধ তুলে নিতে শুরু করে।

২০২৫ সালের ১লা জুন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেয়। এর আগে ২০১৩ সালে হাইকোর্ট তাদের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছিল কারণ তাদের দলীয় গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশের ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়।

একই সময়ে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে ২০২৫ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট খালাস দেয়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেক উপদেষ্টা মনে করেন যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের ট্রাইব্যুনাল বিচারিক মান বজায় রাখেনি এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই পুনরুত্থানকে ১৯৭১ সালের চেতনার প্রতি একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখছে।

পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ১৯৭১-এর অমীমাংসিত ক্ষমা প্রার্থনা

বাংলাদেশের রাজনীতির এই পরিবর্তনের সমান্তরালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ১৯৭১-এর ইস্যুটি পুনরায় সামনে এসেছে। ১৫ বছর পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানায় 36

বাংলাদেশ কেবল ক্ষমা প্রার্থনাই চায়নি, বরং ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের আওতায় না আনা এবং যুদ্ধের সময়কার সম্পদ ভাগাভাগির অমীমাংসিত হিসাবও দাবি করেছে। বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে ৪.৩ বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সাহায্যের ২০০ মিলিয়ন ডলারও অন্তর্ভুক্ত।

পাকিস্তান অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার তার ঢাকা সফরের সময় এই বিষয়ে নমনীয়তা দেখালেও আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ১৯৭১ একটি দুঃখজনক ইতিহাস এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের খাতিরে একে পেছনে ফেলে আসা উচিত। তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি গভীর আবেগের বিষয় যা কোনো আর্থিক লেনদেন বা রাজনৈতিক বোঝাপড়া দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।

উপসংহার: জামায়াতে ইসলামীর দায় এবং ঐতিহাসিক সত্যের অনুসন্ধান

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ভূমিকা কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুল হিসেবে দেখা যায় না। তাদের দায় ঐতিহাসিক, নৈতিক এবং আইনিভাবে প্রমাণিত। একটি সুশৃঙ্খল আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে তারা যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা বিংশ শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যার একটি। বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে তারা একটি উদীয়মান জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে সমর্থনযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই অপরাধের বিচার হওয়ার ফলে কিছু ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেলেও, জামায়াতে ইসলামীর প্রাতিষ্ঠানিক দায় এখনো পুরোপুরি স্বীকার করা হয়নি। বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জামাতের পুনরুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দাবি, অন্যদিকে ১৯৭১ সালের গণহত্যার অমীমাংসিত ক্ষত—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হবে।

জামায়াতে ইসলামীর দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হতে পারে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট স্বীকারোক্তি এবং সেই আদর্শ থেকে সরে আসা যা হিংসা ও নিধনযজ্ঞকে সমর্থন করে। অন্যথায়, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী সর্বদা একটি বিতর্কিত ও নেতিবাচক শক্তির চিহ্ন হয়েই থাকবে। ঐতিহাসিক সত্যের এই অনুসন্ধান এবং বিচারিক কার্যক্রম কেবল অতীতের বিচার নয়, বরং একটি সুন্দর ও সহিংসতামুক্ত ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরির অপরিহার্য অংশ। ১৯৭১ সালের শহীদের রক্ত এবং মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তার প্রকৃত মর্যাদা রক্ষার জন্য এই দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top