নষ্ট প্রজন্ম না নষ্ট সমাজ: বাংলাদেশের রুচি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংকট 2026

নষ্ট ভাষা, নষ্ট রুচি, নষ্ট বিতর্ক- আমাদের সমাজ কোন পথে?

একটি সমাজের অবক্ষয় এক দিনে ঘটে না। তা ধীরে ধীরে আসে ভাষার ভেতর দিয়ে, চিন্তার ভেতর দিয়ে, আলোচনার ভেতর দিয়ে, আর সবচেয়ে বেশি আসে আমাদের সহনশীলতার ক্ষয় হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথমে আমরা কটু কথাকে মেনে নিই, তারপর অপমানকে হাস্যরস ভেবে উপভোগ করি, এরপর গালাগালকে “সোজাসাপ্টা কথা” বলে প্রশংসা করতে শুরু করি। একসময় দেখা যায়, শালীনতা আর যুক্তি হারিয়ে গেছে, আর তার জায়গা নিয়েছে চিৎকার, তিরস্কার, ব্যক্তিপূজা, অন্ধ ভক্তি এবং দলীয় ঘৃণা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এই অবক্ষয়ের চিত্র বহু ক্ষেত্রেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত—সবখানেই এখন শব্দের আগে চিৎকার, তথ্যের আগে আবেগ, যুক্তির আগে পক্ষপাত। কে কী বলল, কতটা জোরে বলল, কতটা তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করল—এসব নিয়েই এখন মানুষের উত্তেজনা। অথচ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি প্রায়ই চাপা পড়ে যায়: আমরা কি আদৌ এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে অপমানই সাহস, আর কুৎসাই বক্তব্যের মানদণ্ড?

নষ্ট প্রজন্ম
নষ্ট প্রজন্ম

একটি জাতির পতন কেবল অর্থনীতিতে হয় না, কেবল রাজনীতিতেও হয় না। জাতির পতন ঘটে তখনই, যখন তার রুচি ভেঙে পড়ে; যখন বিদ্যা আর জ্ঞানের জায়গায় আসে আত্মপ্রচার; যখন সামাজিক সম্মান অর্জিত হয় পরিশ্রমে নয়, বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জোর করে ঢুকে পড়ার মাধ্যমে; যখন লোকজন আর সত্যকে অনুসরণ করে না, বরং সত্যের মতো শোনায় এমন মিথ্যে অনুসরণ করতে শুরু করে। এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি কখনও একক ব্যক্তির সমস্যা হয়ে থাকে না; বরং পুরো জনজীবনের মানসিক সংস্কৃতিকে আক্রান্ত করে।

আজকের সমাজে আমরা এক ধরনের প্রদর্শনবাদী বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি। অনেকেই আর গুণে বড় হতে চান না, চান দৃশ্যমান হতে। দৃশ্যমান হতে পারলেই যেন সম্মান এসে যায়। কেউ কবি হতে চান, কিন্তু কবিতার চেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে আলোচনায় থাকতে। কেউ বক্তা হতে চান, কিন্তু বক্তব্যের চেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে ভাইরাল হওয়ায়। কেউ নেতা হতে চান, কিন্তু নেতৃত্বের ন্যূনতম গুণাবলি না থাকলেও চলে, যদি তিনি ভিড় টানতে পারেন, শ্লোগান তুলতে পারেন, বা বিরোধী পক্ষকে উসকে দিতে পারেন। এভাবে সমাজে এক ধরনের “অভিনয়-নির্ভর মর্যাদা” তৈরি হয়, যেখানে আসল কাজের চেয়ে আড়ম্বরের দাম বেশি।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্মম গতি। এখন যে কেউ চাইলেই বক্তা, বিশ্লেষক, বিপ্লবী, নীতিনির্ধারক—সবকিছু হয়ে যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন কেবল একটি ক্যামেরা, একটি মোবাইল ফোন, কিছু উত্তেজক শব্দ, এবং কোনো না কোনো জনরোষের বিষয়। মানুষ এখন ধৈর্য ধরে পড়তে চায় না; বরং এক লাইনের উসকানিমূলক স্টেটমেন্ট, কয়েকটি চেঁচামেচিপূর্ণ ভিডিও, কিংবা ইমোশনাল স্লোগান—এসবই দ্রুত জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ফলাফল হিসেবে সত্য-অসত্য, জ্ঞান-অজ্ঞতা, মর্যাদা-উচ্ছৃঙ্খলতা—সব একাকার হয়ে যায়।

এই বিকৃত পরিবেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ প্রজন্ম। কারণ তরুণেরা স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত, আবেগপ্রবণ এবং পরিবর্তনকামী। তারা নতুন কিছু চায়, প্রতিবাদ করতে চায়, নিজের পরিচয় খুঁজতে চায়। কিন্তু যখন সমাজ তাদের সামনে আদর্শের বদলে কোলাহল, শিক্ষার বদলে নাটক, আর নৈতিকতার বদলে দ্রুত জনপ্রিয়তা তুলে ধরে, তখন তারা বিভ্রান্ত হয়। এই বিভ্রান্তি থেকে জন্ম নেয় ভুল নায়ক, ভুল ভাষা, ভুল আদর্শ। যে তরুণ একসময় জ্ঞান, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও সৃজনশীলতার পথে যেতে পারত, সে তখন অল্পতেই সস্তা আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হতে চায়। তার হাতে বইয়ের বদলে ক্যামেরা আসে, চিন্তার বদলে স্লোগান আসে, আর আত্মোন্নয়নের বদলে আত্মপ্রদর্শন আসে।

এই জায়গায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলতে হয়। একটি জাতির শিক্ষা কেবল ডিগ্রি দেয় না; সে চরিত্র গঠন করে, যুক্তি শেখায়, সহনশীলতা শেখায়, এবং ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখায়। কিন্তু যখন শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্ঞান নয়, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মুখস্থ, প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং আদর্শিক পক্ষপাত ঢুকে পড়ে, তখন শিক্ষার্থী তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু শিক্ষিত মানুষ তৈরি হয় না। কাগজে ডিগ্রি পাওয়া আর ভেতরে জ্ঞানের আলো পাওয়া এক জিনিস নয়। অনেকেই উচ্চশিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে শিক্ষিত নাও হতে পারে। আর এই পার্থক্যটিই আজকের দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা।

সমাজে যখন প্রকৃত শিক্ষার ঘাটতি দেখা দেয়, তখন লোকজন সহজ ব্যাখ্যার দিকে ঝোঁকে। জটিল সমস্যার জন্য তারা জটিল সমাধান চায় না, বরং কোনো তীক্ষ্ণ বাক্য, কোনো সহজ শত্রু, কোনো দ্রুত উত্তেজনা চাইতে থাকে। এই মানসিকতাই চরমপন্থার উর্বর জমি তৈরি করে। কারণ চরমপন্থা যুক্তির ওপর দাঁড়ায় না; সে দাঁড়ায় ভয়, ক্ষোভ, বিভ্রান্তি এবং গোষ্ঠীমানসিকতার ওপর। যখন মানুষ নিজের চিন্তা দিয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, তখন সে যে কোনো শক্তিশালী স্লোগানের দাসে পরিণত হতে পারে। আর সেখান থেকেই সমাজের ভেতরে গণ-অবিবেচনা জমতে থাকে।

বাংলাদেশে এই অবিবেচনার অন্যতম লক্ষণ হলো—কোনো একটি ঘটনা বা চরিত্রকে কেন্দ্র করে পুরো প্রজন্মকে দোষারোপ করার প্রবণতা। এটি খুবই বিপজ্জনক ও অন্যায্য। একটি প্রজন্মের সবাইকে এক মাপে মাপা যায় না। কারও ভাষা খারাপ হতে পারে, কারও রুচি নষ্ট হতে পারে, কারও রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তার জন্য পুরো প্রজন্মকে “নষ্ট” বলে ফেলা ন্যায্য নয়। তবু সমাজে যখন হতাশা চরমে ওঠে, তখন এমন সাধারণীকরণই জনপ্রিয় হয়। কারণ মানুষ সমস্যার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করতে অলস, আর গোটা জনপদকে গালমন্দ করা অনেক সহজ।

তবে এটাও সত্য যে, কিছু মানুষের অপ্রাসঙ্গিক উত্থান, কিছু অশোভন ভাষ্য, কিছু কোলাহলপূর্ণ উপস্থিতি—এসব অনেক সময় সমাজের রুচির সংকটকে প্রকট করে তোলে। কোনো একজন ব্যক্তি যদি মেধার চেয়ে প্রচারে, মূল্যবোধের চেয়ে বিতর্কে, আর চিন্তার চেয়ে কূটকৌশলে বেশি সফল হয়, তাহলে তাকে ঘিরে যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয় তা আসলে সমাজের দুর্বলতারই প্রতিফলন। আমরা কীকে পুরস্কৃত করছি, সেটিই আমাদের ভবিষ্যৎ বলে দেয়। যদি চিৎকারকে পুরস্কৃত করি, তাহলে পরের প্রজন্ম চেঁচাবে। যদি গালিকে পুরস্কৃত করি, তাহলে পরের প্রজন্ম গালি দেবে। যদি মিথ্যাকে নাটকীয় করে তুলতে পারি, তাহলে পরের প্রজন্ম মিথ্যাকে কৌশল ভেবে গ্রহণ করবে।

একইভাবে রাজনীতিতেও এখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় স্পষ্ট। রাজনীতি যখন আদর্শ, নীতি, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হয়, তখন সমাজ কিছুটা হলেও স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু রাজনীতি যখন ব্যক্তি-নির্ভর, আবেগ-নির্ভর, আর দলীয় অন্ধত্বে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রও ধীরে ধীরে বিকৃত হতে থাকে। পদ, ক্ষমতা ও সুবিধার ভাগ-বাঁটোয়ারাই তখন মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। নীতি, দক্ষতা বা যোগ্যতা নয়—কে কার লোক, কে কতটা অনুগত, কে কতটা কার্যকরভাবে বিরোধী পক্ষকে আঘাত করতে পারে, সেটিই বড় হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিবেশে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, আর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে।

এই আস্থাহীনতার ফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ। তারা দেখে, রোগীর ওষুধের কথা, শিক্ষার মানের কথা, রাস্তাঘাটের কথা, বাজারদরের কথা, কর্মসংস্থানের কথা—এসব বাস্তব ইস্যুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাকে কী নামে ডাকতে হবে, কার বক্তব্য কতটা বিদ্বেষপূর্ণ, কিংবা কার ভিডিও কত মিনিটে ভাইরাল হলো। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেখানে মানুষের জীবন সহজ করা, নিরাপদ করা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা—সেখানে যখন প্রশাসন কেবল বক্তৃতা, প্রতিশ্রুতি এবং পারস্পরিক দোষারোপে আটকে যায়, তখন জনগণ ক্ষুব্ধ হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় কনটেন্ট, গুজব, অপপ্রচার, এবং আরও বেশি বিভাজন।

স্বাস্থ্যখাত এই ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি দেশের মানবিকতার মাপকাঠি। কোথায় ডাক্তার আছে, কোথায় ওষুধ আছে, কোথায় রোগী সেবা পাচ্ছে, কোথায় মাতৃমৃত্যু কমছে, কোথায় শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরেই বোঝা যায় রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে জনগণের পক্ষে কাজ করছে কি না। কিন্তু যখন স্বাস্থ্যখাতে নীতির চেয়ে বক্তব্য বেশি, পরিকল্পনার চেয়ে প্রতিশ্রুতি বেশি, এবং দুর্নীতির অভিযোগের চেয়ে দায়সারা ব্যাখ্যা বেশি দেখা যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই অনাস্থা তৈরি হয়। মানুষ শুধু উন্নয়নই চায় না; সে চায় স্বচ্ছতা। উন্নয়ন যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই দুই খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আরেকটি বিষয় হলো দক্ষ নেতৃত্ব। নেতৃত্ব মানে কেবল পদে বসা নয়। নেতৃত্ব মানে সমস্যা শনাক্ত করা, সঠিক মানুষ নিয়োগ করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, এবং ভুল স্বীকার করার নৈতিকতা থাকা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে নেতৃত্বকে অনেক সময় “কার কতটা দৃশ্যমান” সেই মানদণ্ডে বিচার করা হয়। ফলাফল হিসেবে এমন লোকজনও সামনে আসে, যারা নিজে এখনও প্রতিষ্ঠিত নন, কিন্তু বড় দায়িত্বের কেন্দ্রে বসে যান। এতে ব্যক্তিগত অহংকার বাড়ে, কিন্তু কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ে না। আর যখন অভিজ্ঞতার পরিবর্তে তাড়াহুড়া, আর যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচিতি প্রাধান্য পায়, তখন ক্ষতি হয় দীর্ঘমেয়াদি।

এখানেই আসে “সেলিব্রিটি রাজনীতি” এবং “সেলিব্রিটি বুদ্ধিজীবিতা”র সমস্যা। আজকাল অনেকে বিখ্যাত হলেই ভাবেন তিনি বিশেষজ্ঞ। কেউ জনপ্রিয় হলেই ভাবেন তিনি নৈতিক কর্তৃত্বের অধিকারী। কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েক লাখ অনুসারী পেলেই মনে করেন তার মতামত জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। অথচ জনপ্রিয়তা কোনোভাবেই প্রজ্ঞার নিশ্চয়তা নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ভিড় সবচেয়ে সহজে উচ্ছ্বাসে মাতে, কিন্তু সত্যের কাছে দ্রুত ফিরে আসে না। তাই জনপ্রিয়তার সঙ্গে জ্ঞানকে গুলিয়ে ফেলা ভয়ংকর ভুল। সমাজ যখন এই ভুলটি করে, তখন অনেক অযোগ্য মানুষও “জনতার প্রতিনিধি” হয়ে ওঠে।

তরুণদের এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তরুণ বয়সে যা শোনা হয়, তা বহু সময়েই মানসিক স্থায়ী ছাপ ফেলে। যদি তরুণেরা প্রতিনিয়ত দেখে যে গালি দিয়েও প্রভাব তৈরি করা যায়, অপমান করেও অনুসারী বাড়ানো যায়, এবং তথ্যের চেয়ে আবেগ বেশি কার্যকর—তাহলে তারা কী শিখবে? তারা শিখবে যে, ভদ্র হওয়া দুর্বলতা; যৌক্তিক হওয়া বিরক্তিকর; আর ধৈর্যশীল হওয়া বোকামি। এই মানসিকতা সমাজকে ধ্বংস করে। কারণ একটি দেশকে চালায় কেবল রাজনীতিকেরা না; একে চালায় শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, লেখক, প্রশাসক, অভিভাবক এবং সবচেয়ে বেশি—সচেতন নাগরিকেরা। নাগরিকের মানসিক মান যদি নিচে নামে, তাহলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও নিচে নামে।

অন্যদিকে, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা সামাজিক লাভ তোলার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। ধর্ম মানুষের অন্তরের বিষয়, নৈতিকতার বিষয়, আধ্যাত্মিকতার বিষয়। কিন্তু ধর্মকে যখন স্লোগান, প্রতিপক্ষ-বিদ্বেষ, বা জনমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা সমাজে শান্তির বদলে অস্থিরতা ছড়ায়। ধর্মভিত্তিক ভাষা যদি কেবল শুদ্ধি, করুণা, ন্যায়বিচার ও আত্মসমালোচনার দিকে না যায়, বরং অন্যকে হেয় করার অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে সেটি বিশ্বাসকে দুর্বল করে। সমাজে এ ধরনের প্রবণতা বাড়লে মধ্যপন্থা হারিয়ে যায়, আর মধ্যপন্থা হারালে উগ্রতা সহজেই জায়গা করে নেয়।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্র মৌলবাদী হয়ে ওঠে শুধু আইন বা প্রশাসনের কারণে নয়; তার মানসিক পরিসর সংকীর্ণ হয়ে পড়লেও মৌলবাদী হয়ে ওঠে। যখন প্রশ্ন করার অধিকার কমে যায়, যখন ভিন্নমতকে শত্রু মনে করা হয়, যখন জ্ঞানকে সন্দেহ করা হয়, যখন তরুণকে শেখানো হয় যে সমালোচনা মানেই বিশ্বাসঘাতকতা—তখন সমাজ ধীরে ধীরে একমুখী হয়ে পড়ে। এই একমুখীতাই গণতন্ত্রের শত্রু। কারণ গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়; গণতন্ত্র মানে মতের বৈচিত্র্য, বিতর্কের জায়গা, ভুল সংশোধনের ক্ষমতা এবং বিরোধী কণ্ঠের নিরাপত্তা।

কিন্তু ভেঙে পড়া রুচির সমাজে যুক্তি খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। মানুষ তখন “কে কাকে বেশি অপমান করল” সেটিকে বীরত্ব বলে ধরে নেয়। ভাষার এই দারিদ্র্যই সবচেয়ে বড় সংকেত। একটি ভাষা যত বেশি অশালীন হয়, সেই সমাজের আত্মসম্মান তত কমে যায়। একটি জাতি যখন নিজেকে সম্মান করতে শেখে, তখন সে শব্দচয়নেও সতর্ক হয়। আর যখন সে নিজেকে হালকা ভাবতে শুরু করে, তখন সে ছাঁচবিহীন, কাঁটা-ছেঁড়া, আক্রমণাত্মক, এবং আত্মনাশী ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কথার ভেতরেই তখন দেশের মানসিক অবস্থা ধরা পড়ে।

এ কথা বললে অনেকে বলেন—সমালোচনা করতেই হবে, তীব্র ভাষাও দরকার। হ্যাঁ, সমালোচনা দরকার। কঠোর সমালোচনা দরকার। কিন্তু সমালোচনা আর কুৎসা এক জিনিস নয়। সমালোচনা যুক্তি তৈরি করে, কুৎসা কেবল ক্ষোভ বাড়ায়। সমালোচনা ত্রুটি দেখায়, কুৎসা মানুষ ভাঙে। সমালোচনা ভবিষ্যৎ গড়ে, কুৎসা কেবল বর্তমানকে বিষাক্ত করে। যে সমাজ এই পার্থক্য বুঝতে পারে না, সে সমাজে বিরোধিতা ক্রমে অসভ্যতায় রূপ নেয়।

আমাদের চারপাশে আজ যে অবক্ষয় দেখা যায়, তা থেকে বের হতে হলে প্রথম শর্ত হলো ভাষার সংস্কার। পরিবারে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিসে, রাজনীতিতে, টেলিভিশনে, ইউটিউবে—সবখানেই ভাষার শুদ্ধি দরকার। শুদ্ধি মানে কেবল ব্যাকরণ নয়; শুদ্ধি মানে শালীনতা, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং সত্যনিষ্ঠা। এরপর দরকার তথ্যের সংস্কার। যাচাই না করে কিছু বিশ্বাস না করা, গুজবে কান না দেওয়া, এবং উত্তেজক কনটেন্টের বদলে নির্ভরযোগ্য তথ্য খোঁজা। তারপর দরকার রুচির সংস্কার। কীকে আমরা তালি দিচ্ছি, কীকে আমরা পুরস্কার দিচ্ছি, কার ওপর আমরা হাসছি—এসব প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে। কারণ রুচি নষ্ট হলে রাষ্ট্র মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় কথা, কোনো দেশকে ভালো করতে চাইলে শুধু সরকার বদলালেই হয় না; নাগরিকের মানসিকতাও বদলাতে হয়। যে নাগরিক নিজে বিভ্রান্ত, সে সঠিক নেতৃত্ব বেছে নিতে পারে না। যে নাগরিক নিজে আবেগের দাস, সে যুক্তিনির্ভর সমাজ চাইলেও তা ধরে রাখতে পারে না। যে নাগরিক নিজে মিথ্যে প্রশংসায় অভ্যস্ত, সে সত্যিকারের যোগ্য মানুষকেও চিনতে ব্যর্থ হয়। তাই এই সংকট কেবল শাসনের নয়; এটি সামাজিক চেতনারও সংকট।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকার নয়, কিন্তু আলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। আলো আনতে হবে শিক্ষা দিয়ে, শালীনতা দিয়ে, কাজ দিয়ে, এবং সত্যের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আমাদের তরুণদের এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে তারা জনপ্রিয় হওয়ার আগে দায়িত্বশীল হতে শিখবে, বক্তব্য দেওয়ার আগে পড়তে শিখবে, আর সমালোচনা করার আগে বুঝতে শিখবে। আমাদের সমাজকে এমন জায়গায় ফিরতে হবে, যেখানে বুদ্ধি অপমানিত নয়, আর রুচি তুচ্ছ নয়। যেখানে স্লোগান নয়, সত্য মূল্যবান; যেখানে নাটক নয়, নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ; যেখানে ভাইরাল হওয়া নয়, কাজে থাকা বড় বিষয়।

অবক্ষয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হলে প্রথমে অবক্ষয়কে শনাক্ত করতে হয়। আর সেটি করতে গেলে আত্মপ্রবঞ্চনা কমাতে হয়। আমাদের মানতে হবে—কিছু মানুষ জনপ্রিয় হলেও তারা আদর্শ নয়; কিছু বক্তব্য জোরালো হলেও তা সত্য নয়; কিছু আন্দোলন উত্তেজনাপূর্ণ হলেও তা গঠনমূলক নয়; আর কিছু শোরগোল সমাজের ভেতরকার রোগকে ঢেকে রাখলেও তাকে সারায় না। সমাজকে সারাতে হলে রোগের নাম বলতে হয়, তবে ভাষা সংযত রেখে। কারণ অসভ্য ভাষায় বলা সত্যও অনেক সময় নিজের শক্তি হারিয়ে ফেলে।

এই কারণে আজ সবচেয়ে প্রয়োজন একটি নৈতিক প্রত্যাবর্তন। ফিরে যেতে হবে সেই জায়গায়, যেখানে একজন মানুষকে তার চরিত্রে বিচার করা হয়, শোরগোলে নয়। যেখানে যোগ্যতা সম্মান পায়, পরিচিতি নয়। যেখানে ভিন্নমত শত্রু নয়, বরং চিন্তার পরিপূরক। যেখানে তরুণরা নায়ক খোঁজে না, আদর্শ খোঁজে। যেখানে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, বরং মানুষের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্র। আর যেখানে “নষ্ট প্রজন্ম” বলে কাউকে চিরস্থায়ী অভিশাপে ফেলে না দিয়ে, বরং সেই নষ্ট হওয়ার কারণগুলো সংশোধন করার সাহস দেখানো হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুবই সহজ: আমরা কি শব্দের কোলাহলে ডুবে যাব, নাকি চিন্তার শৃঙ্খলায় ফিরব? আমরা কি গালি, ভিড়, ভুয়া জনপ্রিয়তা আর ঘৃণার রাজনীতি বেছে নেব, নাকি শিক্ষা, সৌজন্য, সত্য এবং দায়িত্বশীলতার পথে হাঁটব? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে আমাদের সমাজ আগামী দিনে কী হবে—একটি রুচিশীল, গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র, নাকি কেবল অস্থিরতা, অপপ্রচার আর ক্ষণিকের উত্তেজনায় ভরা এক ক্লান্ত জনপদ।

দেশকে বাঁচাতে হলে আগে ভাষাকে বাঁচাতে হবে। ভাষা বাঁচলে চিন্তা বাঁচবে। চিন্তা বাঁচলে রুচি ফিরবে। আর রুচি ফিরলে তবেই সমাজ আবার নিজেকে চিনতে শিখবে।

Scroll to Top